বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬

আমার ছোট মামা

আমার মামা বিপ্লবী ছিলেন। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন, বিশ্বাস করতেন সশস্ত্র বিপ্লবের ভেতর দিয়ে সমাজ বদলের। চিরকাল ছন্নছাড়া লোকটা চলে গেলেন।

খুব ছোট বেলায় বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বার্মা চলে গিয়েছিলেন, একা একা অনেক বছর ঘুরে বেড়িয়েছেন। দাঁতের ডাক্তারি শিখেছিলেন, জাদু দেখাতেন লোক জমিয়ে। অনেক বছর পর তাকে চট্টগ্রাম থেকে খুঁজে আনেন আমার নানা। 

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, আমার বাকি দুই মামার মতই। বাড়ির কুয়োতে বন্দুক লুকানো ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী রেইড দেয়ার পর আবার পালিয়ে গেলেন।

যুদ্ধের পর তাকে স্থিতু করার অনেক চেষ্টা করা হলো। বনের বাঘ পোষ মানানোর চেষ্টা। বিয়ে দেয়া হলো তাকে। বাড়ি করে দেয়া হলো। কিন্তু কখনোই সংসার তাকে বাঁধতে পারেনি। বাড়ি থাকতেন না, এক ছেলে এক মেয়ে, ঠিক মত কখনোই পায়নি তাকে। 

দুর্দান্ত দাঁতের ডাক্তার ছিলেন, একটা চেম্বার ছিল। ওটা আসলে একটা পার্টি অফিস বলা যায়। গরিব মানুষ আসতো, টাকা দিত কি দিত না।

৯০ এ সমাজতন্ত্রে পতনের পর, রাশিয়াপন্থীদের সাথে দূরত্ব হয়ে গেল। চীনপন্থীদের সাথে মামা চরমপন্থার দিকে চলে গেলেন। বাড়িতে একে৪৭ দেখেছি আমি। আমাদের বাসায় আসতেন হঠাৎ করে। আমার কাছে একসপ্তাহের জন্য কাপড়ে মোড়ানো পিস্তল রেখে গেলেন একবার, কি ভয়ংকর ব্যাপার। 

১/১১ এর পর গ্রেফতার হয়ে গেলেন। ওনার সাথের সবাই ক্রসফায়ার হয়ে যাচ্ছিলেন। আমাদের পুরো পরিবারের অনেক চেষ্টায় বেশ কয়েক বছর পর বের হয়ে এলেন।

আর রাজনীতিতে জড়াননি। কিন্তু গ্রামের মানুষের জন্য যতটুকু করা যায়, করেছেন। গ্রামের রুগীদের ঢাকায় এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা তার নিয়মিত কাজ ছিল। পুরো জীবন যার যেখান সাহায্য লেগেছে মামা সেখানে ছিলেন। কোন দিন এমন হয়নি যে তাকে ডাকলে পাওয়া যায়নি। 

মামী আর আমার দুই কাজিনের কষ্ট আর ক্ষোভ আমি বুঝি। একজন স্বামী বা বাবার দায়িত্ব মামা হয়তো কখনোই পালন করেননি। তাদের অনেক না পাওয়ার কষ্ট ছিল। আমরা সবাইকেই একই ছাঁচে কাটতে চাই। এই লোকটা আসলে বিয়ে সংসার না করলেও হত। 

এই মানুষটা সবার কাছে যেমনই হোক আমার কাছে চিরকাল ছিলেন বিষ্ময়, আমার সুপারহিরো। আমি আজকে যা তার অর্ধেক এই মানুষটার জন্য। ক্লাস সিক্সে থাকতে আমাকে দিয়েছিলেন ছোটদের রাজনীতি আর অর্থনীতি। আমার পুরো চিন্তার কাঠামো তৈরী হয়েছে মামার প্রভাবে। রাহুল সাংকৃত্যায়নের বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ, গোর্কির মা, প্রবীর ঘোষের অলৌকিক নয় লৌকিক, রাসেলের আমি কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না, ইস্পাত আর দুনিয়া কাঁপানো দশদিন একএক বার আমাকে মামা এনে দিয়েছিলেন। 

আমি বই পড়তে শিখেছি আরো ছোটবেলায়। ক্লাস টুতে প্রথম পড়েছিলাম রুশ দেশের উপকথা, থ্রি তে টারজান, এর পর অনেক বছর বুঁদ ছিলাম তিন গোয়েন্দায়। অনেক দিন ফিকশন পড়ার পর এই নন ফিকশন আমাকে পুরোপুরি বদলে দিল। যুক্তি, বিজ্ঞান আর  প্রগতিশীলতা হয়ে ওঠে আমার চিন্তার মুল কেন্দ্র।

দারুন বক্তা ছিলেন, অনেক গল্প বলতেন, এখন বুঝি তার সবটা হয়তো সত্যি নয়। কিন্তু কি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম। আমার বন্ধু আর অনেক কলিগের সাথেও পরিচয় হয়েছিল মামার। তারা সেই এক দেখাতেই আর কখনো ভুলতে পারেনি ওনাকে। 

আমি অনেক কঠিন কঠিন বই পড়েছি অনেক বেশি ছোট বেলায়। যেটা আমার পড়ার অভ্যাস তৈরী করেছে। প্রায় পাঁচ হাজার বই আছে আজকে আমার, শেলফের দিকে তাকালে অনেকটাই মামার ছবি দেখা যায়।

আমি নিজেকে বামপন্থী তাত্বিক মনে করতাম। এক সময় বুঝেছি, কমুনিজমও একটা ধর্মই। কিন্তু জ্ঞান, মুক্তচিন্তা আর সবকিছুকে প্রশ্ন করার যে বীজ মামা আমার ভেতর রোপন করে গিয়েছিলেন তাই আমার সারাজীবনের ধ্রুবতারা হয়ে আছে। 

জীবন দুই অসীম অন্ধকারের ভেতর এক স্ফুলিঙ্গ। হুমায়ুন আজাদ যেমন বলেছিলেন,” আমি জানি, ভালো করেই জানি, কিছু অপেক্ষা করে নেই আমার জন্যে; কোনো বিস্মৃতির বিষণ্ন জলধারা, কোনো প্রেতলোক, কোনো পুনরুত্থান, কোনো বিচারক, কোনো স্বর্গ, কোনো নরক; আমি আছি, একদিন থাকবো না, মিশে যাবো, অপরিচিত হয়ে যাবো, জানবো না আমি ছিলাম। নিরর্থক সব পুণ্যশ্লোক, তাৎপর্যহীন প্রার্থনা, হাস্যকর উদ্ধত সমাধি; মৃত্যুর পর যে-কোনো জায়গাই আমি পড়ে থাকতে পারি,- জঙ্গলে, জলাভূমিতে, পথের পাশে, পাহাড়ের চূড়োয়, নদীতে।”

যে কোন জায়গাতে থাকতে পারতেন আপনি। অথচ কিভাবে আপনার চলে যাবার দিন সকালেই আপনার সাথে দেখা হয়ে গেল আমার। শেষ বারের মত। 

বিদায় মামা। 

 

শনিবার, ১২ জুন, ২০১০

তবু এসো

আজ না হয় এটুকুই থাক,
বিকেলের রোদ শাড়ীর আঁচলের
ছায়ায় থামুক অন্য কোন দিন।
ঘোলাটে তারার মত রাস্তার বাতিগুলো
জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়, আরেক দিন
ব্যাকুল থাকুক ঝিঁঝিপোকা।
কলমির ডালের মত ঝুলতে থাকা
শেষ বাসটার হাতল, আজ অন্য
কারোর মুঠোয় খুঁজে নিক আয়ুরেখা।
তীব্র চাবুকের মত জ্বলতে থাকা পিচগুলো,
রথ আর রিক্সার ভীড় মিলিয়ে গিয়ে
শান্ত মেঠোপথ হয়ে যাওয়ার আগেই,
আজ না হয় তুমি চলেই যাও;
তবু এসো, কাল।

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯

মৃত্যু এখানে

মৃত্যু এখানে মাঝরাস্তায় হাঁটে;
প্রাতঃভ্রমনের নিয়মিত আয়োজনে
মৃত্যু এখানে বুটজুতো পরে ছোটে।
মৃত্যু এখানে শপিং মলের ভীড়ে
রঙীন ফতুয়া দরদাম করে কেনে;
মৃত্যু এখানে বারো টাকা ভাড়া পেলে
নিয়ে যাবে ঠিক অলিগলি চিনে চিনে।
মৃত্যু এখানে কলিং বেলের সুরে
পরিচিত কোন মুখ হয়ে ভেসে ওঠে;
মৃত্যু এখানে আধোঘুম জাগরনে
স্কুলের ব্যাগের বোঝা তুলে নেয় পিঠে।
মৃত্যু এখানে অফিস ফিরতি বাসে
ক্লান্ত লাইনে অপেক্ষমান ছায়া;
মৃত্যু এখানে দূরবাসী ছাত্রীর
চোখের জলে বাবার জন্য মায়া।

শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯

একুশ বলছে

একুশে ফেব্রুয়ারী দিনটি গুরুত্বপুর্ণ তো বটেই তবে আরো গুরুত্বপুর্ণ একুশে ফেব্রুয়ারী যে বার্তাটি পৌছায় আমাদের কাছে সেটি। সেই বার্তাটি একুশ ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ে আমাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবনে। একুশ প্রথমত বলে যে ভাষা খুব জরুরী, নিজের ভাষা, মাতৃভাষা। কতটা জরুরী সেটা একুশ খুব স্পষ্ট করে দেয়, বলে ততটাই জরুরী যতটা কিনা জরুরী আমার প্রান ধারনের ইচ্ছা। একুশ দেখায় সবাই আবার এরকমই যে ভাবে তাও নয়। এই মতের বিরোধীরাও আছে আর তাদের শক্তিও কম নয়। তাই একুশ বলে যে সতর্কতায় কমতি দেয়া যাবে না, ভাষাটাকে আগলে রাখা চাই, চর্চা দিয়ে, শিক্ষা আর প্রয়োগের শুদ্ধতা দিয়ে।

একুশ জানিয়ে দিয়েছে ভাষা আমার অধিকার, তবে এখানেই শেষ নয়, এই অধিকার পূর্ণতা পাবে না যদি না আমি আমার দায়িত্বটুকুও বুঝে নেই। আমার এই দায়িত্বের প্রকাশ ঘটবে আমার ভাষার সব প্রয়োগে, তা সে কথা বলাতেই হোক আর এমএসএন মেসেঞ্জারে চ্যাট করার সময় হোক। আমি এই দায়িত্বের প্রকাশ খুঁজবো প্রিয় লেখকের নতুন উপন্যাসে, দৈনিকের লঞ্চডুবির মন খারাপ করা খবরে, নেশা লাগানো টিভি নাটকের সংলাপে এমনকি এফ এম রেডিওর অনুরোধের আসরে।

বোঝা যাচ্ছে কাজটা সহজ নয়। ভাষার কোন প্রয়োগ শুদ্ধতার সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে জল ঘোলা করার ইচ্ছা আমাদের পথিকৃতদের কেউ কেউ যে একেবারেই রাখেন না এমন বলা শক্ত। এসব সীমানা প্রাচীর একেবারেই তুলে দেওয়ার পক্ষেও মত রাখেন অনেকে। আর তখনি একুশের বার্তা জানিয়ে দেয় যে দ্বন্দ্ব শেষ হয়ে যায়নি, আরো বদল বাকি।
একুশের বইমেলায় কোন কোন বই চোখের সামনে মেলে ধরে বুক কেঁপে ওঠে, যেমনটা হয় নতুন কোন রেডিও চ্যানেলের উপস্থাপনা আচমকা শুনে ফেললে। একজন নতুন লেখক, যিনি চমৎকার প্রচ্ছদে, প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা থেকে ছেপে এনেছেন তাঁর প্রথম বই, তাকে উৎসাহ দিয়ে প্রথম দু পরিচ্ছেদে চোখ বুলিয়ে মনে হয় লেখার আগে খুব একটা পড়া হয়ে ওঠেনি তার। ভাষার ওপর দখলের ঘাটতি মেনে নেয়ার চেষ্টাকে আরো কষ্টসাধ্য করে তোলে লেখকের হাতের নাগালে কোন বানান অভিধান না থাকার বেদনা।

পৌনঃপুনিকতার জালে আটকে পড়া জনপ্রিয় লেখকেরা পুস্তকপন্যের কাটতি বাড়িয়ে কিছু পাঠক ধরে রেখে ভাষার দায় কিছুটা যে মেটান না তা নয়। তবে আমরা সবাই সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি যখন তাদের ভাঁড়ারে অর্থস্রোতের বিপরীতে কিছু সাহিত্যবস্তু তাদের পুস্তকপন্যের পাতায় শোভা পাবে।

এতকিছুর পরও আমরা কিন্তু জিতে আছি। একুশ শুধু বলে আলোটাকে উঁচু করে ধরতে, যাতে প্রান্তে যারা আছে তারা মিছিলে সামিল হতে পারে। ভাষা আমাদের বুকের ভেতরই আছে, শুধু তাকে নিয়ে আসতে হবে ঠোঁটের ডগায়, কলমের মাথায় আর কিবোর্ডের বোতামে।